খুঁজুন
সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২

আওয়ামী দোসর গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাস ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির করেও বহাল তবিয়তে

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: বুধবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৫, ১২:২৯ অপরাহ্ণ
আওয়ামী দোসর গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাস ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির করেও বহাল তবিয়তে
গৃহায়ণ গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তর গণপূর্ত অধিদফতরে গত ১৬ বছর ধরে গড়ে উঠা লুটপাটের সহযোগী বিগত সরকারের কর্মকর্তাদের বিতাড়িত করার কার্যকর পদক্ষেপ শুরু করেছে সরকার।

কিন্তু মাঝখানে এসে মন্ত্রণালয় থমকে যায় অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের সিন্ডিকেটের হাতে। এখনোও প্রকৌশলী সদস্যদের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাদেরকে বদলি করতে পাছেন না অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়। তারা এখনও বহাল তবিয়তে অফিস করছেন। কেউ বা বছরের পর বছর পোস্টিং ঢাকায়। তাও বা গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ বা ঘুরেফিরেই আবার ঢাকায় বদলি হচ্ছেন।

গণপূর্তের সাবেক মন্ত্রী/ সচিব এবং প্রকৌশলীদের নামেও একাধিক মামলা হয়েছে। সেই সাবেক মন্ত্রী/ সচিব এবং প্রকৌশলীদের আস্থাভাজনরা এখনও অধিদপ্তর/ সার্কেলে আরাম আয়েশে অফিস করছেন। সাবেক বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে গেছে। নিয়োগ বানিজ্য, বদলী বানিজ্য, টেন্ডার বানিজ্য করে শত শত কোটি টাকা আয় করেছেন তাঁরা।

গণপূর্ত অধিদপ্তরে যে কয়েকজন প্রভাবশালী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী অনিয়ম ও দূর্নীতি করে নামে বেনামে দেশ ও বিদেশে শত শত কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন শেখর চন্দ্র বিশ্বাস তাদের মধ্যে একজন। ঘুরে ফিরে ঢাকার এক ডিভিশন থেকে আরেক ডিভিশনে বদলি হন! ঢাকা ছাড়তে হয়নি, এমনকি ঢাকা যেন তাকে ছাড়তেই চাই না।

সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার সলস গ্রামের নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রফুল্ল চন্দ্র বিশ্বাসের ছেলে শেখর চন্দ্র বিশ্বাস। বিসিএস ২৪ তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা ২০০৫ সালে চাকরিতে যোগদান করেন। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই নীতিভ্রষ্ঠ হয়ে টাকা ইনকামের নেশায় হয়ে ওঠেন দূর্নীতির বরপুত্র।

অভিযোগ উঠেছে সিরাজগঞ্জের সাবেক প্রভাবশালী সংসদ সদস্য তানভীর ইমাম ( এইচ টি ইমামের সন্তান শেখ হাসিনার সাবেক রাজনৈতিক উপেদষ্টা) তার নিজ এলাকার সংসদ সদস্য হওয়ায় তার প্রভাব খাঁটিয়ে বাগিয়ে প্রাইজ পোষ্টিং ।

তিনি ২০১৮ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম), পিডব্লিউডি ই/এম উড ওয়ার্কশপ বিভাগ, ঢাকা পদে কর্মরত ছিলেন। ২০১৮ সালের একটি সরকারি নথি থেকে জানা যায় যে, তিনি এই পদে কর্মরত থাকাকালীন সপরিবারে বিদেশে ভ্রমণের জন্য ছুটি নিয়েছিলেন, মুলত তিনি ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নিশি রাতের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে (শেখ হাসিনা আর ক্ষমতায় আসবে না ভেবে) ভ্রমণের নামে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করে আসেন।

নির্বাচনের পর স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার গঠন করলে তিনি আবারো দেশে ফিরে এসে দূর্নীতিবাজ সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও শাহাদাত হোসেন ও তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম কে ম্যানেজ করে বাগিয়ে নেন আওয়ামীলীগের তীর্থস্হানখ্যাত গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম), গণপূর্ত ই/এম পিএন্ডডি বিভাগ,  পদ ।

‘মুজিব কর্ণার’ও ‘বঙ্গবন্ধু গ্যালারি’র উদ্বোধন করছেন তৎকালীন গণপূর্ত ই/এম পিএন্ডডি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাস

গোপালগঞ্জে থাকা অবস্থায় স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম কে খুশী করতে স্ব প্রণোদিত হয়ে নিজ উদ্যেগে বঙ্গবন্ধু গ্যালারি তৈরী করেন। শেখ সেলিম তার এই উদ্যেগে খুশী হয়ে  তাকে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর কাছে সুপারিশ করে পদোন্নতি দিয়ে ২০২১ সালের ৭ই জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত ই/এম ডিজাইন সার্কেল, ঢাকা এই পদে পদায়িত করেন।

নিয়মিত দায়ীত্বের বাইরে অতিরিক্ত যে সমস্ত দায়িত্ব পেয়ে দূর্নীতি ও অনিয়ম করেছেন—

*উত্তরা এপার্টমেন্ট প্রকল্পে- নির্বাহী প্রকৌশলী ( রিজার্ভ) পদে থাকাকালীন দূর্নীতি।

*খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের নতুন কার্যালয় এবং অডিটোরিয়াম নির্মান প্রকল্পে লিফট যাচাই বাচাই কারিগরি কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে জার্মানির লিফটের বদলে টাকা খেয়ে চায়না লিফটের অনুমোদন।

*বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সমন্বিত কলকারখানা পরিদর্শন কার্যক্রমের জন্য তাকে ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল সেখান থেকে তিনি স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের আস্থাভাজন হয়ে দূর্নীতির মাধ্যমে শত কোটি টাকার বেশী অবৈধ ইনকাম করেন।

*গণপূর্ত অধিদপ্তরের  সিডিউলে সারা বাংলাদেশে অবস্থিত গণপূর্তের অফিসে  ওয়ালটন কোম্পানির তৈরি  লিফট একচেটিয়া   টেন্ডারের মাধ্যমে  স্থাপনের জন্য ওয়ালটনের টাকায় ইউরোপ ভ্রমন।

*আজিমপুরে পার্কিং শেড নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত কমিটির (সদস্য সচিব ) খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের ভাতিজা প্রকৌশলী নিয়াজ মোঃ তানভীর আলম কে বাঁচাতে টাকার বিনিময়ে মিথ্যা রিপোর্ট প্রদান।

 ভারতে টাকা পাচার (মানিলন্ডারিং):

শেখর চন্দ্র বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ হল মানিলন্ডারিং। দেশের বাহিরে তার প্রচুর অবৈধ সম্পদ রয়েছে। বিশ্বস্থ সূত্র জানিয়েছে, শেখর চন্দ্র বিশ্বাস দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ নামে বেনামে বিনিয়োগের পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে পাশের দেশ ভারতে পাচার করেছেন। এক বিশেষ অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোলকাতার রাজারহাট নিউ টাউন এলাকায়  প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাস একটি বিলাসবহুল বাড়ী নির্মাণ করেছেন। এই ভবন নির্মাণের সমস্ত টাকা তিনি হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচার করেছেন। এখানেই শেষ নয়,  প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাস অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডায়ও বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে ।

জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ:

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাসের বাড়ি সিরাজগঞ্জে হলেও ঢাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন একাধিক বাড়ি ও ফ্লাট। বিশেষ অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য মতে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাসের বাবা নিম্ন মধ্যবিত্ত হলেও রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার মোহাম্মদী হাউজিং সোসাইটির ৯ নং রোডের ৫/৭ নং আলিশান বাড়িটি কয়েক কোটি টাকা খরচ করে তৈরী করেছেন। এ ছাড়াও  মালিবাগ, ধানমন্ডি এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় রয়েছে তার বিলাসবহুল পাঁচটি ফ্লাট এবং বাড়ী।

গত ৫ই আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমানোর অন্যতম ক্যারিশম্যাটিক কার্যালয়ে পরিণত হওয়া গণপূর্ত ই/এম ডিজাইন সার্কেল, ঢাকার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রয়েছেন শেখর চন্দ্র বিশ্বাস এখনো স্বমহিমায় উদ্ভাসিত।

ছাত্র জনতার এই আন্দোলন নস্যাৎ করতে সড়ক ভবনের নিজ কক্ষেমধ্যরাত পর্যন্ত ছাত্রলীগ আর যুবলীগ নেতাদের সাথে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকতেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাস । আর তার সকল অপকর্মে সঙ্গ দিতেন অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ও হিসাব রক্ষক।

এই অফিস থেকেই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাস প্রতিদিন ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে মহানগর যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের জন্য শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে পাঠাতেন লক্ষ লক্ষ টাকা।

গত ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা দিল্লি পালালেও গণপূর্ত ই/এম ডিজাইন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী  শেখর চন্দ্র বিশ্বাসের মতো তার দোসররা এখনও দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘাপটি মেরে রয়েছেন। তারা সুযোগ বুঝে লক্ষ্য অর্জনে ছলে বলে কৌশলে এমনকি বিগত সময়ের বিপুল পরিমাণ উপার্জিত অর্থ দিয়ে টার্গেট পূরণেও সক্ষম হচ্ছেন। শেখ হাসিনা পালালেও গণপূর্ত ই/এম ডিজাইন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আওয়ামী দোসর শেখর চন্দ্র বিশ্বাসের মতো  হাসিনার অনেক পেতাত্মা রয়েছেন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

তারা বিগত সময়ে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করে বিত্তশালী হয়েছেন। এখন তারাই সেই অর্থ দিয়ে দুর্নীতিবাজদের ম্যানেজ করে ফেলছেন। অন্যদিকে দুর্নীতিবাজরা রাতারাতি ভোল পাল্টিয়েও ফেলেছেন।

বহুল আলোচিত ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা সরকারের বিশ্বস্ত সহচর ও সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার গণপূর্ত ই/এম ডিজাইন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আওয়ামী দোসর শেখর চন্দ্র বিশ্বাসের নগ্ন হস্তক্ষেপে দিনাজপুর (সওজ) সড়ক বিভাগে কোটি কোটি টাকার ভয়াবহ লুটতন্ত্র কায়েম করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে,  প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাসের  ল্যান্ড ফোন ও তার হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দেওয়া হলে  রিসিভ না করাই তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংবাদ প্রতিদিন কে বলেন,  ‘যারা অতীতে দুর্নীতি করেছেন তাদের তালিকা হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ নিয়ে কাজও শুরু হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হবে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

গণপূর্তে দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন সংবাদ প্রতিদিন কে বলেন, ‘ইতোমধ্যে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। সেখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত দুদকের টিম খতিয়ে দেখছে। তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দুদক সেই প্রতিষ্ঠান বা অধিদপ্তরগুলোতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ নিচ্ছে। আপনাদের মাধ্যমে গণপূর্তের এই প্রকৌশলীর বিষয়ে জানতে পারলাম তাই সুনির্দিষ্ট কোনো দুর্নীতির খবর আমরা সাংবাদিকদের মাধ্যমেও জানতে চাই। এতে আমরা কাজ করতে আরও সুবিধা হবে। সরকারি-বেসরকারি যেকোনো খাত কিংবা ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবরকে দুদক খুব গুরুত্বসহকারে নিচ্ছে।’

এই দুর্নীতিবাজ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী  ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারপূর্বক আইনের আওতায় এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে সচেতনমহল মনে করেন।

দীর্ঘদিন যাবৎ সিডিউলের তথ্য ফাঁস, লটারীর নামে নাটক, কমিশন  বাণিজ্যে ঠিকাদারদের ৭/৮ জনের ভাগ্য খুলতে সহায়তা করে নিজেও হয়েছেন শত-শত কোটি টাকার মালিক।

দুর্নীতিগ্রস্থ এই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এখনো কীভাবে গণপূর্ত ই/এম ডিজাইন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন তা খতিয়ে দেখতে দুদকের কঠোর হস্তক্ষেপসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাননীয় উপদেষ্টা এবং প্রধান প্রকৌশলীর সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সচেতন মহল।

শতাংশ হিসাব করে ঘুষ নেন সাতকানিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার টিনু চাকমাঃ অফিস সহকারী শাকিলের ইশারায় চলে পুরো অফিস- ঘুষ না দিলে রেজিস্ট্রি নেই

নাফি রহমান
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫, ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ
   
শতাংশ হিসাব করে ঘুষ নেন সাতকানিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার টিনু চাকমাঃ অফিস সহকারী শাকিলের ইশারায় চলে পুরো অফিস- ঘুষ না দিলে রেজিস্ট্রি নেই

জমি-জায়গা নিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে ‘সংকটে’ পড়েননি বা ‘জিম্মি’ হতে হয়নি এমন কাউকে পাওয়া বিরল। বিশেষ করে অর্থনৈতিক হয়রানির শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। উপজেলা পর্যায়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বড় কর্তা সাব-রেজিস্ট্রার। বর্তমানে নবম গ্রেডে বেতন পান তারা। অথচ ব্যতিক্রম ছাড়া কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক তারা। চাকরি করেন উপজেলায়, কিন্তু অট্টালিকা তুলেছেন জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরে। কীভাবে সম্ভব? একজন সাব-রেজিস্ট্রার বেতন পান ন্যূনতম ২২ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৬০ টাকা।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেবাখাত সংস্কার হলেও চট্টগ্রামের সাতকানিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখনো ঘুষ বাণিজ্যের আখড়া হয়ে আছে। ঘুষ, অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে সরকারি এই কার্যালয়টি। দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সেবা প্রত্যাশীরা। চাহিদা মতো ঘুষ দিলে সাব রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে অসম্ভব বলে কিছুই নেই।

অভিযোগ রয়েছে, সাতকানিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার টিনু চাকমা ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করেন না। এতে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয় গ্রাহক ও দলিল লেখকদের। এদিকে ‘খাস লোক’ হিসেবে পরিচিত কার্যালয়ের কর্মচারী শাকিলের ‘সংকেত পেলে’ সাব রেজিস্ট্রার চোখ বুঝে সই করেন। শাকিলকে ম্যানেজ করতে পারলেই ‘সাহেব ম্যানেজ’ হয়ে যান। তার মাধ্যমেই এ কার্যালয়ে ঘুষ লেনদেন হয়।

আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে মৌজা মূল্যের ন্যূনতম ১ শতাংশ টাকা ঘুষ দিতে হয়। দলিল যেকোনো ধরনের হোক না কেন এবং সরকার রাজস্ব পাক বা না পাক, এই অর্থ অফিসে জমা না দিলে দলিলে রেজিস্ট্রার স্বাক্ষর করেন না। আর এই টাকা হাতবদল হয় অফিসের কর্মচারী শাকিলের মাধ্যমে।

গত কয়েক মাস ধরে সাতকানিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক এবং ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

অভিযোগ উঠেছে, শাকিল প্রাপ্ত অর্থ সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে পৌঁছে দেন এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছেও নিয়মিত মাশোহারা দেওয়া হয়। তবে এসব বিষয়ে শাকিলের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

জানা যায়, সাতকানিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়মিত রেজিস্ট্রি হওয়া দলিলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আসে সাফ কবলা, দানপত্র ও এয়াজনামা থেকে। এগুলোতে সরকার মৌজা মূল্যের যথাক্রমে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে রাজস্ব পেয়ে থাকে। তবে হেবা ঘোষণাপত্র ও পাওয়ারনামার মতো দলিলে সরকার রাজস্ব পায় না। অথচ এই দলিল রেজিস্ট্রিতেও মৌজা মূল্যের ১ শতাংশ হারে ঘুষ দিতে হয়।

বেশ কয়েকবার সাতকানিয়া সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলিল লেখক ও সেবা নিতে আসা ব্যক্তির বাইরেও অনেক মানুষের জটলা। অফিস চত্বরে ঘুরতে থাকা বেশির ভাগ লোকই দালাল চক্রের সদস্য। তারা কম টাকায় দলিল নিবন্ধন করে দেওয়ার কথা বলে পছন্দের দলিল লেখকের কাছে ‘মক্কেল’ ধরে আনে। বিনিময়ে পায় কমিশন।

একাধিক দলিল লেখক জানান, সরকার নির্ধারিত ফি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করার কথা বললে সংশ্লিষ্টরা নানা অজুহাত দেখান। আর শুধু জমি রেজিস্ট্রি নয়, দানপত্র, বণ্টনপত্র, ঘোষণাপত্র, অংশনামা ও চুক্তিপত্রের মতো দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে কয়েক গুণ টাকা দিতে হচ্ছে দাতাগ্রহীতাদের। দলিলের নকল (অনুলিপি) সংগ্রহ করতেও সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি জানান, ৫৫ লাখ টাকার একটি হেবা দলিল রেজিস্ট্রির সময় তাঁর কাছে দলিল লেখক প্রথমে মৌজা মূল্যের ২ শতাংশ টাকা দাবি করেন। পরে দরকষাকষির পর ৭০ হাজার টাকায় কাজ সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ৪০ হাজার টাকা অফিসে ঘুষ হিসেবে জমা দেওয়া হয়। একাধিক দলিল লেখকও স্বীকার করেছেন, ওয়াকফ দলিল ছাড়া সব দলিলে এভাবে ঘুষ দিতে হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তি, আইনজীবী বা দলিল লেখক সমিতির নেতাদের ক্ষেত্রে এই ঘুষ কিছুটা কমানো হয়। তবে ছাড়ের পরিমাণ সাধারণত ০.৩ শতাংশের বেশি নয়। রাজস্বের হিসাবে দেখা যায়, গত জুন থেকে আগস্ট তিন মাসে সাতকানিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সরকার পেয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা। সে অনুযায়ী বছরে রাজস্ব দাঁড়ায় প্রায় ৫২ কোটি টাকা। আর এই টাকা তিন প্রকার দলিল তথা সাফ কবলা, দানপত্র ও এয়াজনামার উপর ভিত্তি করে ১ বছরে রেজিস্ট্রিকৃত মৌজামূল্য দাড়ায় প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। অথচ একই পরিমাণ রাজস্ববিহীন দলিলও রেজিস্ট্রি হয়। অর্থাৎ বছরে সর্বমোট প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা মৌজা মূল্যের দলিল রেজিস্ট্রি হয়। যেখান থেকে অন্তত ১০ কোটি টাকা ঘুষ সংগ্রহ করে সাতকানিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস।

সাতকানিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই ১ শতাংশ প্রথা দীর্ঘদিনের। প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতবদল হয়, তবে এর বেশিরভাগ সাব-রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে ভাগ হয়ে যায়। এটা বন্ধ হওয়া দরকার। সাধারণ মানুষের পকেট কেটে এই টাকা আদায় করা হয়।

দলিল লেখকরা কেন প্রতিবাদ করেন না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের সরকারি সনদ নবায়নের জন্য সাব-রেজিস্ট্রারের সুপারিশ লাগে। এছাড়া ঘুষ বন্ধ হলে রেজিস্ট্রির সংখ্যা কমে যাবে, ফলে দলিল লেখক ও অফিস সংশ্লিষ্টদের আয়ও কমবে। তাই কেউ মুখ খুলে না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাব-রেজিস্ট্রার টিনু চাকমার মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার খন্দকার জামীলুর রহমান বলেন, ঘুষ লেনদেনের কথাটা আমরা প্রায় শুনে থাকি। তবে এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ভুক্তভোগীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাইনি। যেহেতু এখানে দলিল লেখকদের একটা সংশ্লিষ্টতা আছে, সুতরাং নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রকৃত অপরাধীকে তদন্তের মাধ্যমে সনাক্ত করা যাবে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর রিপোর্ট করতে পারবো।

তিনি আরও বলেন, রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে আসা মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য আমাদের নিয়মিত মনিটরিং চলছে। ভুক্তভোগীরা যদি সরাসরি জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে অভিযোগ করেন অথবা লিখিতভাবে জানিয়ে দেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব। এ ক্ষেত্রে কারও প্রভাবশালী পরিচয় বা পদমর্যাদা দেখেও ছাড় দেওয়া হবে না। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।

তিনি সতর্ক করে বলেন, অভিযোগ না করে কেবল কথাবার্তায় বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার সমাধান হবে না। তাই জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রকৃত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করা সম্ভব।

এখনো সংকটাপন্ন খালেদা জিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫, ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ
   
এখনো সংকটাপন্ন খালেদা জিয়া
  • অবস্থার উন্নতি হলে বিদেশে নেওয়ার পরিকল্পনা
  • তাঁর অবস্থা একই পর্যায়ে। চিকিৎসকরা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন তা তিনি গ্রহণ করতে পারছেন : ডা. এ জেড এম জাহিদ
  • রাজনৈতিক অঙ্গন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্বেগ
  • উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় দোয়া
  • হাসপাতালের সামনে ভিড় না করতে বিএনপির অনুরোধ
  • বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থা শুক্রবারের মতো গতকাল শনিবারও সংকটাপন্ন ছিল। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসনের বর্তমান শারীরিক অবস্থা বিদেশে নিয়ে যাওয়ার মতো নয়। তবে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে নেওয়ার ব্যাপারে ভিসা ও যোগাযোগ সংক্রান্ত কাজ এগিয়ে রাখা হয়েছে। গতকাল গুলশানে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা তুলে ধরেন।বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে বলে জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা কিছুটা সংকটাপন্ন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা তাঁর চিকিৎসা চলছে। আমেরিকার জন হপকিন্স ও লন্ডন ক্লিনিকের বিশিষ্ট চিকিৎসকরা তাঁর চিকিৎসা করছেন।শুক্রবার রাতে বেশ সময় নিয়ে তাঁরা বোর্ডসভা করেছেন। নিজেদের মেডিক্যাল বোর্ডে তাঁরা মতামত দিয়েছেন—চিকিৎসাটা কী ধরনের হবে?’গত রাত ৯টায় এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন সর্বশেষ পরিস্থিতি জানিয়ে বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থা একই পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ চিকিৎসকরা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন, তা তিনি গ্রহণ করতে পারছেন। কাজেই এই চিকিৎসা যেন উনি গ্রহণ করে সুস্থ হয়ে যেতে পারেন, সে জন্য আপনারা সবাই দোয়া করবেন।

    বিশেষজ্ঞ দিয়ে চিকিৎসা চলছে : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে বলে জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা কিছুটা সংকটাপন্ন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা তাঁর চিকিৎসা চলছে। আমেরিকার জন হপকিন্স এবং লন্ডন ক্লিনিকের বিশিষ্ট চিকিৎসকরা তাঁর চিকিৎসা করছেন। শুক্রবার রাতে বেশ সময় নিয়ে তাঁরা বোর্ড সভা করেছেন। নিজেদের মেডিক্যাল বোর্ডে তাঁরা মতামত দিয়েছেন—চিকিৎসাটা কী ধরনের হবে?

    বিএনপি চেয়ারপারসনের বিদেশে নেওয়া প্রসঙ্গে এ সময় মির্জা ফখরুল বলেন, ‘তাঁকে বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন।এ বিষয়ে তাঁরা বলছেন, হয়তো নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তাঁর এখন যে শারীরিক অবস্থা, সে অবস্থায় তাঁকে বিদেশে নেওয়ার মতো কোনো শারীরিক অবস্থায় নেই। শারীরিক অবস্থা স্ট্যাবল হলে তখন চিন্তা করে দেখা হবে, তাঁকে নেওয়া সম্ভব হবে কি না।’

    বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘তবে বিদেশে নেওয়ার জন্য যেসব বিষয় প্রয়োজন—যেমন ভিসা, সেসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে এবং সেগুলো মোটামুটি কাজ এগিয়ে আছে। অর্থাৎ যদি প্রয়োজন হয়, যদি দেখা যায় শি ইজ রেডি টু ফ্লাই, তখন তাঁকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে।’

    সাংবাদিকদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আপনাদের মাধ্যমে আমি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিতে চাই, বিএনপি চেয়ারপারসন ও দেশনেত্রীর অসুস্থতার খবরে পুরো দেশবাসী উদ্বিগ্ন। অনেকেই হাসপাতালের সামনে আসছেন, ভিড় করছেন। এতে খালেদা জিয়াসহ অন্য রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ডাক্তাররাও বিরক্তবোধ করছেন। আমি সবাইকে ভিড় না করার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

    গত রাতে হাসপাতালের সামনে সংবাদ সম্মেলনে ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘চিকিৎসা করার দায়িত্ব হাসপাতালের। ভালো করার মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। সারা পৃথিবীতে ভালো যে চিকিৎসা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, সেটি এখানে আয়োজন করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। খালেদা জিয়াকে বিদেশ নেওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে তাঁর শারীরিক সুস্থতা ও মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর।’

    ডা. জাহিদ বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে তাঁর ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিণী সৈয়দা শর্মিলা রহমান এবং তাঁর ভাই সাঈদ এস্কান্দার রয়েছেন। সার্বিক সহযোগিতা করছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সব স্তরের নেতাকর্মী। আমেরিকার জন হপকিন্স ও মাউন্ট সিনাই, ইউকে, সিঙ্গাপুর, চীন, সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি নামকরা হাসপাতালের ডাক্তারদের সমন্বয়ে যৌথ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাঁর চিকিৎসা চলছে। খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য আমরা সবার কাছে দোয়া চাই।’

    এখনো শঙ্কামুক্ত নন : হাসপাতালে খালেদা জিয়াকে দেখতে আসা বিএনপির কয়েকজন নেতা ও অন্যরা জানান, তাঁর শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত, তবে এখনো তিনি শঙ্কামুক্ত নন।

    গতকাল দুপুরে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন বলেন, ‘আগের মতোই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্ট্যাবল আছেন, কিন্তু এখনো ইমপ্রুভ করেননি।’

    বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ‘ক্রিটিক্যাল, তবে স্থিতিশীল’ বলে জানিয়েছেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা। তিনি বলেন, ‘সতর্কতা মেনে আমার উনাকে (খালেদা জিয়া) দেখার সুযোগ হয়েছে। উনি সজ্ঞানে আছেন, সজাগ আছেন। চিকিৎসক এবং নার্স উনাকে যে নির্দেশনা দিচ্ছেন, সেগুলো তিনি অনুসরণ করতে পারছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রিটিক্যাল, তবে ফাইট করছেন।’

    বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক জানান, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা স্বস্তিদায়ক, যা কিছুটা আশাব্যঞ্জক। এর আগে শুক্রবার রাত দেড়টার পর হাসপাতাল থেকে বের হয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমরা দূরত্ব বজায় রেখে উনার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি শুধু, উনি আমাদের চিনতে পেরেছেন এবং আমরা সালাম দিয়েছি, উনি জবাব দিয়েছেন।’

    ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রে সংক্রমণজনিত জটিলতায় সাত দিন ধরে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় দলীয় নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝে উদ্বেগ আরো বেড়েছে। গত শুক্রবার দেশব্যাপী মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে বিএনপি। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বেগম জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।

    বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সবাই আন্তরিক দোয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করায় জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে সবার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

    হাসপাতালের সামনে ভিড় না করতে বিএনপির অনুরোধ : শুক্রবার রাত থেকেই খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির খবর পেয়ে হাসপাতালে ভিড় করতে থাকেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। গতকাল বিকেল পর্যন্ত সেই ভিড় অব্যাহত থাকে। তাঁরা শুভেচ্ছা বার্তাসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে অবস্থান করেন এবং পরে হাসপাতালের সামনেই দোয়া মাহফিল ও তবারক বিতরণ করেন। তবে কর্মীদের অতিরিক্ত ভিড়ে হাসপাতালের সামনে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং রোগী পরিবহনেও সমস্যা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দিয়ে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের হাসপাতালের সামনে ভিড় না করার অনুরোধ জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বেগম খালেদা জিয়ার খোঁজখবর নিতে আসা নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড়ের কারণে খালেদা জিয়াসহ অন্য রোগীদের চিকিৎসাসেবায় বিঘ্ন ঘটছে। এ কারণে বিএনপি ও খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে দলের নেতাকর্মী, সমর্থকসহ শুভাকাঙ্ক্ষীদের এভারকেয়ার হাসপাতালে ভিড় না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।’

    হাসপাতালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা : শুক্র ও শনিবার বিভিন্ন সময় খালেদা জিয়ার খোঁজ নিতে হাসপাতালে যান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। গতকাল দুপুরে হাসপাতালে যান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রধান সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা ও মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ।

    এর আগে খালেদা জিয়াকে দেখতে যান বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবিব ও অন্য নেতাদের এভারকেয়ার হাসপাতালে দেখা যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এভারকেয়ারে আসেন।

    গতকাল রাত ১০টার পর বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর নেতৃত্বে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা।

    এদিকে হাসপাতালে যেতে না পারলেও খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করে বার্তা দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধানরা। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের পৃথক বার্তায় খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।

    উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া : গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীও হাসপাতালে গিয়ে খোঁজখবর নেন। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় বেগম খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন মোনাজাত পরিচালনা করেন।

    বিদেশে নেওয়ার প্রস্তুতি : বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হলেই পরিবারের সদস্যরা তাঁকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন। গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘লন্ডনের যে হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের অধীনে চার মাস থেকে তিনি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে এরই মধ্যে যোগাযোগ করেছেন তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী।’

    ঢাবিতে সাদা দলের উদ্যোগে দোয়া মাহফিল : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় দোয়া মাহফিল হয়েছে। গতকাল বাদ আসর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ঢাবি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের উদ্যোগে এই মিলাদ মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

    ঢাবি সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান, প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ঢাবি সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম ও অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান, আইবিএর অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন, ঢাবির কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমেদসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের নেতারা। দোয়া পরিচালনা করেন মসজিদের খতিব মাওলানা মুফতি নাজির আহমদ।

ঝিনাইদহে ভাতিজার ছুরিকাঘাতে চাচা নিহত

ঝিনাইদহ অফিস
প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫, ৯:৫৪ পূর্বাহ্ণ
   
ঝিনাইদহে ভাতিজার ছুরিকাঘাতে চাচা নিহত

ঝিনাইদহ শহরের পবহাটি এলাকার সিটি মোড় নামক স্থানে ভাতিজার ছুরিকাঘাতে মুরাদ মন্ডল (৪০) নামে এক ইলেকট্রিক মিস্ত্রি নিহত হয়েছেন। গতকাল শনিবার বেলা দেড়টার দিকে পারিবারিক বিরোধের জের ধরে তাকে হত্যা করা হয়। নিহত মুরাদ মন্ডল পবহাটি গ্রামের আফজাল মন্ডলের ছেলে। ঝিনাইদহ সদর থানার ওসি (তদন্ত) শামসুজ্জোহা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে বড় ভাই আলম মন্ডলের ছেলে সৌরভ ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে হত্যা করে। প্রতিবেশী কামরুজ্জামান জানান, জমিজাতি নিয়ে পারিবারিক বিরোধের ধরে শুক্রবার বড় চাচা আলম মন্ডলকে মারধর করে মুরাদ। সে ঘটনার প্রতিশোধ নিতে আলম মন্ডলের ছেলে সৌরভ শনিবার দুপুরে মুরাদ মন্ডলের ইলেকট্রিক দোকানে আমলা চালিয়ে তাকে উপর্যুপরি ছুটি আঘাত করে হত্যা করে। ঝিনাইদহ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, নিহত মুরাদ মন্ডলের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনা এখনো মামলা হয়নি, তবে হত্যাকারীকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ অভিযান শুরু করেছে।

You cannot copy content of this page