বাগেরহাটের ডিসি ও এসপি কে ‘হোয়াটসঅ্যাপে’ একাধিক বিদেশি নম্বর থেকে হুমকি: পর্দার আড়ালে কারা?
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর আঘাত বা শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়, তবে এবারের প্রেক্ষাপটটি কিছুটা ভিন্ন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কেন্দ্রিক। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং পুলিশ সুপারকে (এসপি) টার্গেট করে সাম্প্রতিক এই টেলিফোন হুমকি কেবল একটি স্থানীয় ঘটনা নয়, বরং এটি বর্তমানে প্রচলিত ডিজিটাল অপরাধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার এক বিশেষ প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
রোববার সকাল থেকেই বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরীর দাপ্তরিক হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একের পর এক ফোন কল আসতে থাকে। একাধিক বিদেশি নম্বর থেকে আসা এসব কলে অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং বিভিন্ন বিষয়ে হুমকি প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রের দুজন অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে এমন আচরণে খোদ প্রশাসনের ভেতরেই তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
এই ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত অংশটি হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ক্লিপ।
সেখানে দেখা যাচ্ছে, নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের একজন নেতার ফেসবুক আইডি থেকে সরাসরি পুলিশ সুপারকে ফোন দেওয়া হয়েছে। ওই অডিওতে শোনা যায়, এসপি ফোন রিসিভ করা মাত্রই অপর প্রান্ত থেকে চরম অভদ্রতা এবং আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। জনৈক সাদ্দাম নামক এক ব্যক্তির সাথে প্রশাসনের আচরণের সূত্র ধরে এসপিকে লক্ষ্য করে গালিগালাজ করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া ওই অডিও ক্লিপটি শতভাগ সত্য। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পুলিশ সুপারকে কথা বলার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। অপর প্রান্ত থেকে অনবরত হুমকি দিয়ে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
এটি স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, ফোনকারীরা কোনো গঠনমূলক আলোচনা নয়, বরং কর্মকর্তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতেই এই পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে।
হুমকির শিকার হওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন অত্যন্ত দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন।
তিনি জানান, রোববার সকাল থেকেই তিনি বিভিন্ন নম্বর থেকে অনভিপ্রেত ফোন কল পাচ্ছেন। তবে তিনি এতে মোটেই বিচলিত নন। ডিসি বলেন, প্রশাসন সবসময় সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে জনগণের পাশে ছিল। যে বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা করার চেষ্টা হচ্ছে, সেখানেও আমাদের ভূমিকা ছিল ইতিবাচক। কিন্তু কিছু বট নম্বর বা বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে এই ধরনের কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। আমরা সিনিয়র কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করছি এবং দ্রুতই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরীও ফোন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কারা এর নেপথ্যে কাজ করছে এবং কোন দেশ থেকে বা কোন মাধ্যম ব্যবহার করে ফোনগুলো করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে খুব শীঘ্রই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার করে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হেনস্থা করার প্রবণতা বেড়েছে। এক্ষেত্রে সরাসরি মোবাইল কল না করে হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্য কোনো ইন্টারনেট ভিত্তিক কলিং অ্যাপ ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ভার্চুয়াল নম্বর বা বট নম্বর ব্যবহার করে, যা ট্র্যাক করা তুলনামূলক কঠিন। বাগেরহাটের ঘটনায় ব্যবহৃত নম্বরগুলো বিদেশি হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, দেশের বাইরে অবস্থানরত কোনো গ্রুপ অথবা দেশের ভেতরে থেকে ভিপিএন ব্যবহারকারী কোনো চক্র এই অপকর্মের সাথে জড়িত।
বাগেরহাটের স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার সাথে আলাপকালে জানা যায়, এই ধরনের ঘটনা কেবল অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, বরং চরম বিব্রতকর। রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বিষয়ে থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা বা সাধারণ ডায়েরি করা না হলেও প্রশাসনের ভেতরে এটি নিয়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। কর্মকর্তাদের মতে, কোনো একটি দুঃখজনক বা হৃদয়বিদারক ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদল সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। তারা সরাসরি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের টার্গেট করে রাষ্ট্রের চেইন অব কমান্ড বা প্রশাসনিক শৃঙ্খলায় আঘাত হানার চেষ্টা করছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের ফেসবুক আইডি থেকে ফোন দেওয়া এবং সেই অডিও প্রকাশ করা একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। এর মাধ্যমে তারা অনুসারীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ানো এবং প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার কৌশল নিয়েছে। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে এবং প্রশাসনের ওপর থেকে আস্থা কমাতে একটি বিশেষ গোষ্ঠী এই প্রোপাগান্ডা মিশন চালাচ্ছে।
বাগেরহাটের সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের মতো কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব। যদি জেলা পর্যায়ের সর্বোচ্চ কর্মকর্তারাই এভাবে সাইবার হয়রানির শিকার হন, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাই এই ডিজিটাল সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসন এখন এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে। সাইবার ক্রাইম ইউনিট ইতিমধ্যে এসব ফোন কলের উৎস অনুসন্ধানে নেমেছে। সন্দেহভাজন ফেসবুক আইডিগুলোর আইপি অ্যাড্রেস এবং ট্রাফিক অ্যানালাইসিস করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড যারা করছে তাদের পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাগেরহাটের এই ঘটনাটি একটি অশনিসংকেত। ডিজিটাল যুগে কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক নম্বরগুলো জনস্বার্থে উন্মুক্ত থাকে, আর সেই সুযোগটিকেই হাতিয়ার করছে অপরাধীরা। এই সাইবার হামলা মোকাবিলায় কেবল আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা দেয়াল আরও মজবুত করা এবং গুজব বা ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনগণকে গুজবে কান না দেওয়ার এবং সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন