বেনাপোল কাস্টমস হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা উদ্ভব চন্দ্রপালের বিরুদ্ধে মাসে কোটি টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত পচনশীল পণ্য খালাসকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও শুল্ক ফাঁকির একাধিক অভিযোগ উঠেছে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের পরীক্ষণ গ্রুপ–৩–এর দায়িত্বে থাকা রাজস্ব কর্মকর্তা উদ্ভব চন্দ্রপালের বিরুদ্ধে। আমদানিকারক, সিএন্ডএফ প্রতিনিধি ও স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, নির্ধারিত অর্থ না দিলে পণ্য খালাসে নানাভাবে হয়রানি করা হয়, আর সন্তোষজনক অর্থ পেলে শুল্ক ফাঁকির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজস্ব কর্মকর্তা উদ্ভব চন্দ্রপাল বর্তমানে পরীক্ষণ গ্রুপ–৩–এর দায়িত্বে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক গণমাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সংবাদ প্রকাশিত হলেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ট্রাক প্রতি ঘুষ আদায়ের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, পচনশীল পণ্য পরীক্ষণের নামে প্রতি ট্রাক থেকে আনুমানিক ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই অর্থ পরিশোধের পরই পরীক্ষণ রিপোর্টে স্বাক্ষর করা হয়। অন্যথায় ফাইলে নানা ত্রুটি দেখিয়ে পণ্য খালাস বিলম্বিত করা হয়।
একাধিক আমদানিকারক প্রতিনিধি জানান, কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে টিআর (ট্যাক্স রেগুলেশনস) না দেওয়া, পণ্য নামিয়ে শতভাগ পরীক্ষণের ভয় দেখানোসহ বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
সিন্ডিকেট ও আত্মীয়করণের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানায়, এক ফল ব্যবসায়ী আত্মীয়ের সঙ্গে যোগসাজশে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাতে গোনা কিছু ব্যবসায়ীর পণ্য দ্রুত খালাস দেওয়া হলেও অন্যরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এমনকি কয়েকজন প্রতিনিধির মাধ্যমে মাঠপর্যায় থেকে ঘুষ সংগ্রহের অভিযোগও উঠেছে।
এক সিএন্ডএফ প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“পরীক্ষণ গ্রুপ–৩–এ অতিরিক্ত ঘুষ ও আত্মীয়করণের কারণে ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত। অনেক আমদানিকারক বাধ্য হয়ে বেনাপোল বন্দর ছেড়ে ভোমরা বন্দরের দিকে ঝুঁকছেন।”
তার দাবি, গত এক মাসেই পরীক্ষণ গ্রুপ–৩ থেকে দৃশ্যমানভাবে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ঘুষ আদায় হয়েছে বলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, গত এক মাসে পরীক্ষণ গ্রুপ-৩ থেকে আনুমানিক অর্ধ কোটি টাকা দৃশ্যমান ঘুস আদায় করা হয়েছে। আর ঘুসের টাকা আদায়ে রাজস্ব কর্মকর্তার আত্মীয় এক ফল ব্যবসায়ীর যোগসাজসে তৌহিদ ও শুভ সংগ্রহ করছে।
আমদানিকারকদের অভিযোগ
আমদানিকারক সরাফত ইসলাম বলেন,
“গত সাত-আট বছর ধরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে পান আমদানি করছি। আগে এমন সমস্যায় পড়তে হয়নি। এখন গাড়ি প্রতি ১০ হাজার টাকা না দিলে পরীক্ষণ রিপোর্টে স্বাক্ষর করা হয় না। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
আরেক আমদানিকারক জানান, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। এর ফলে সরকারও কোটি কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ।
বেনাপোলের সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী সমিতির এক নেতা জানান,
“৫ আগস্টের পর থেকে কাঁচামাল পরীক্ষণে কোনো বড় ধরনের অবৈধ পণ্য আটক হয়নি, যা রহস্যজনক। আগে নিয়মিত কোনো না কোনো চালান ধরা পড়ত। নামমাত্র পরীক্ষণ ও টিআর ঘোষণার আড়ালে অনিয়ম হচ্ছে বলে আমাদের ধারণা।”
তিনি আরও বলেন, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে দৈনিক ঘুষ লেনদেন ও সংশ্লিষ্টদের অবৈধ আয়ের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে পরীক্ষণ গ্রুপ–৩–এর দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় শুনে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে কথা বলতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, কাস্টমস কমিশনার আবু হোসেন মোহাম্মদ খালিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা যায়নি।
উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা
ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, বেনাপোল বন্দরের পচনশীল পণ্য খালাস প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফেরাতে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ জরুরি। তা না হলে ব্যবসায়ীরা বন্দর বিমুখ হবে এবং সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাতে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন