গ্রামীণফোনের মুনাফায় বড় ধস: এক বছরেই নেই ৬৭৩ কোটি টাকা, নেপথ্যে ডলার ও ঋণের বোঝা
দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের প্রধান প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন বা জিপি গত এক বছরে তাদের ব্যবসায়িক ইতিহাসে এক বড় ধরনের মুনাফা হ্রাসের সম্মুখীন হয়েছে। কোম্পানিটির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী কমা ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে তাদের নিট বা প্রকৃত মুনাফা কমেছে প্রায় ১৮.৫ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৭৩ কোটি টাকা।
ব্যবসায়িক মন্দা কমা বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বা ডলার সংকট এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের সুদের চাপ কমা এই ত্রিমুখী সংকটে পড়ে দেশের শীর্ষ এই অপারেটরটির আর্থিক ভিত কিছুটা নড়বড়ে হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গ্রামীণফোনের বার্ষিক হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায় কমা গত এক বছরে কোম্পানিটির মোট আয় বা টার্নওভার খুব একটা কমেনি। ২০২৫ সালে তারা ব্যবসা করেছে ১৫ হাজার ৮০৬ কোটি টাকার কমা যা আগের বছরের ১৫ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকার তুলনায় মাত্র ৩৯ কোটি টাকা কম। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে মুনাফার ঘরে। ২০২৪ সালে যেখানে জিপির নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা কমা ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ২ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ব্যবসা প্রায় স্থিতিশীল থাকলেও মুনাফার একটি বিশাল অংশ অদৃশ্য হয়ে গেছে অতিরিক্ত খরচের খাতে।
কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে মুনাফা কমার প্রধান তিনটি কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্রামীণফোনের ঋণের সুদজনিত ব্যয় গত বছর মারাত্মকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে এই খাতে খরচ ছিল ৪৯৯ কোটি টাকা কমা যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪১ কোটি টাকায়। এক বছরেই আর্থিক খরচ বেড়েছে ১৪২ কোটি টাকা। ডলারের বিনিময় মূল্যজনিত লোকসানও একটি বড় কারণ। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি ও অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনে গ্রামীণফোনকে বড় মাশুল দিতে হয়েছে।
এক বছরে এই খাতে খরচ বেড়েছে ১৭ কোটি টাকা কমা যা মোট মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ ছাড়া সরকারকে বাড়তি কর প্রদানের ক্ষেত্রেও কোম্পানিটি ছাড় পায়নি। বরং গত বছর গ্রামীণফোন ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বেশি কর দিয়েছে। ২০২৫ সালে কোম্পানিটি সরকারি কোষাগারে কর বাবদ ১ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা জমা দিয়েছে।
মুনাফা কমলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় রাখতে কার্পণ্য করেনি গ্রামীণফোন পরিচালনা পর্ষদ। কোম্পানিটি ২০২৫ সালের জন্য মোট ২১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে শেয়ারপ্রতি ১১ টাকা বা ১১০ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন হিসেবে আগেই বিতরণ করা হয়েছে এবং বাকি ১০ টাকা ৫০ পয়সা বা ১০৫ শতাংশ চূড়ান্ত লভ্যাংশ হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে কোম্পানিটি তার মোট মুনাফার ৯৮ শতাংশেরও বেশি টাকা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি লভ্যাংশ দেওয়ার ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ হার হলেও বিশ্লেষকদের মতে কমা মুনাফা থেকে এত বেশি টাকা সরিয়ে নেওয়া ভবিষ্যতের বিনিয়োগ সক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে।
গত সোমবার গ্রামীণফোনের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই লভ্যাংশের সিদ্ধান্ত আসার পর থেকেই শেয়ারবাজারে জিপির শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে কমা আগামী ২০ এপ্রিল বার্ষিক সাধারণ সভার মাধ্যমে এই লভ্যাংশ অনুমোদন করা হবে এবং রেকর্ড ডেট বা লভ্যাংশ প্রাপ্তির যোগ্যতা নির্ধারণের তারিখ ৩ মার্চ নির্ধারণ করা হয়েছে।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও শেয়ারবাজার বিশ্লেষকদের মতে কমা গ্রামীণফোনের আয়ের সিংহভাগই ডাটা বা তথ্য এবং ভয়েস কল থেকে এলেও বর্তমানে ডাটার দাম নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অপারেশনাল বা পরিচালনা খরচ বৃদ্ধি তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের মোবাইল ব্যবহারের ধরনেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে কমা যা পরোক্ষভাবে রাজস্বে প্রভাব ফেলছে। মুনাফায় ৬৭৩ কোটি টাকার ঘাটতি গ্রামীণফোনের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ডলার সংকট ও সুদের হার নিয়ন্ত্রণ না হলে আগামী বছরগুলোতেও এই চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ৯৮ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে কমা গ্রামীণফোন এখনো তার বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ রিটার্ন বা লাভ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।


আপনার মতামত লিখুন