চুয়াডাঙ্গার ডিসি/এসপির অদম্য সাহসিকতা ও নিরপেক্ষতায় ব্যালট বিপ্লবে নতুন ভোরের সূর্যোদয়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ দেড় দশকের রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক পরিবেশ, ভোটাধিকার হরণ এবং গণতান্ত্রিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে চুয়াডাঙ্গার মানুষ এক অভূতপূর্ব ‘ব্যালট বিপ্লব’ সম্পন্ন করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সাথে রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক ‘গণভোট’—এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী যে অদম্য সাহসিকতা ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, তা আজ সারা দেশের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
শনিবার সকাল থেকেই চুয়াডাঙ্গার প্রতিটি জনপদ, আলমডাঙ্গা থেকে দামুড়হুদা আর সদর থেকে জীবননগর—সর্বত্রই ছিল বিজয়ের উল্লাস। চুয়াডাঙ্গা-১ ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের চূড়ান্ত ফলাফল এবং গণভোটের রায় বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ অঞ্চলের মানুষ কেবল প্রার্থী নির্বাচিত করেনি, বরং তারা একটি নতুন বাংলাদেশের রূপরেখাকে ‘হ্যাঁ’ বলে আলিঙ্গন করেছে।
একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ কামাল হোসেন এবং পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা চুয়াডাঙ্গাবাসী দীর্ঘকাল মনে রাখবে। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়েছিল।
জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকগণ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ এবং পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি সুশৃঙ্খল চেইন অব কমান্ড কাজ করেছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব এবং পুলিশের সমন্বিত টহল ভোটারদের মনে এই বিশ্বাস জাগিয়েছিল যে, ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’। এই আস্থার ফলেই চুয়াডাঙ্গার ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
আসন নং ০৭৯, চুয়াডাঙ্গা-১ (আলমডাঙ্গা ও সদরের একাংশ) আসনে এবার লড়াই ছিল মূলত আদর্শিক। এই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মো. মাসুদ পারভেজ এক বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন।
মোট ১৮১টি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, মাসুদ পারভেজ (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ২,১১,০৪১ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা মোঃ শরীফুজ্জামান (ধানের শীষ) পেয়েছেন ১,৫৩,১৯৩ ভোট। জয়ের ব্যবধান ৫৭,৮৪৮ ভোট। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ জহুরুল ইসলাম (হাতপাখা) ১০,১২২ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন।
এই আসনে মোট ৫,১১,৬৫৭ জন ভোটারের মধ্যে ৩,৮১,২৩০ জন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রদত্ত ভোটের হার ৭৪.৫১%, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ভোটারদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ তাদের রাজনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনে কতটা উন্মুখ ছিল।
আসন নং ০৮০, চুয়াডাঙ্গা-২ (দামুড়হুদা ও জীবননগর) আসনেও পরিবর্তনের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। এখানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. রুহুল আমিন ২,০৮,০১১ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মাহমুদ হাসান খান (ধানের শীষ) পেয়েছেন ১,৬৩,৮৭৭ ভোট। জয়ের ব্যবধান ৪৪,১৩৪ ভোট।
এই আসনে ভোটার উপস্থিতির হার চুয়াডাঙ্গা-১ এর চেয়েও বেশি ছিল। মোট ৪,৯২,৪৩০ জন ভোটারের মধ্যে ৩,৮৫,৪৪৭ জন ভোট দিয়েছেন, যা শতাংশের হিসেবে ৭৮.২৭%। এই আসনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, তরুণ ভোটার এবং নারী ভোটারদের একটি বিশাল অংশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে রায় দিয়েছেন।
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে সংবিধান সংস্কারের ‘গণভোট ২০২৬’। চুয়াডাঙ্গার দুটি আসনেই ভোটাররা বিপুলভাবে ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোট দিয়ে বর্তমান রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।


আপনার মতামত লিখুন