কৃষি মন্ত্রণালয়ের ৭৬০ কোটির প্রকল্পে মাগুরার অনিয়মের নায়ক মাশরুম বাবুল বহাল তবিয়তে
মাগুরায় কৃষি মন্ত্রণালয়–এর ৭৬০ কোটি টাকার ‘পার্টনার-ডিএএম’ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকার ও বিশ্বব্যাংক–এর অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল কৃষি খাতে পুষ্টি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও সহনশীলতা বৃদ্ধি। তবে মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা, অর্থ ব্যয় ও নীতিমালা অনুসরণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। নির্দেশিকা অনুযায়ী ১২ দিনব্যাপী ‘অন দ্য জব’ প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হওয়ার কথা; খাবার, উপকরণ, ভাতা ও লজিস্টিক সহায়তার ব্যয় সরকারি বরাদ্দ থেকেই দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ—বাস্তবে অর্থ আদায়, ভাতা কম দেওয়া ও নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের মতো অনিয়ম ঘটেছে।
‘বিনামূল্যে’ প্রশিক্ষণে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
অংশগ্রহণকারীদের দাবি, পিকনিকের নামে জনপ্রতি ৩০০ টাকা করে আদায় করা হয়। ২৫ জনের ব্যাচ থেকে প্রায় ৯ হাজার টাকা তুলে ঝিনাইদহের একটি পর্যটনকেন্দ্রে নেওয়া হয়। অথচ নীতিমালায় অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রশিক্ষণার্থীদের আরও অভিযোগ, প্রথম পর্যায়ে ১২ হাজার টাকা ভাতা বরাদ্দ থাকলেও ৯ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়; পরে সংবাদ প্রকাশের পর তা ১১ হাজারে সমন্বয় করা হয়। আবাসিক প্রশিক্ষণের কথা থাকলেও বাস্তবে অনাবাসিকভাবে ক্লাস নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অনুমোদিত প্রশিক্ষক ও আর্থিক গরমিল প্রশ্নে
স্থানীয় অংশীদার হিসেবে ‘ড্রিম মাশরুম ভ্যালি’–এর সংশ্লিষ্টতার কথা জানা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, অনুমোদিত প্রশিক্ষক তালিকা অনুসরণ না করে ক্লাস নেওয়া হয়েছে। ‘মাশরুম বাবুল’ নামে পরিচিত বাবুল আক্তার নিজেই একাধিক ক্লাস নিয়েছেন বলে দাবি প্রশিক্ষণার্থীদের। তবে তিনি প্রকল্পের অনুমোদিত প্রশিক্ষক কিনা—সে বিষয়ে স্পষ্ট নথি দেখাতে পারেননি বলে অভিযোগ।
সর্বশেষ উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণে ২৫ জনকে ১১ হাজার টাকার চেক দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তাৎক্ষণিক উত্তোলন সম্ভব হয়নি—এমন অভিযোগও উঠেছে। পরে অর্থ জোগাড় করে চেকের টাকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন অংশগ্রহণকারী।
তদন্ত ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া
সংবাদ প্রকাশের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাগুরা সদর এলাকায় অভিযান চালায়। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে বিল-ভাউচার, প্রশিক্ষণ নথি ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, কিছু বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত চলছে। প্রকল্প কার্যালয়ের এজেন্সি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ড. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-ফারুকও অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা জানিয়েছেন।
সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাপের অভিযোগ
অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিক মিরাজ আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা উদ্যোগ, হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। তিনি মাগুরা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান পদক্ষেপের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকের অল্প সময়ের মধ্যে কোটি টাকার সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টিও তদন্ত করা প্রয়োজন। অতীতে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প ও প্রণোদনার সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত সচিব নাসির-উদ-দৌলা পরে কথা বলবেন বলে জানান।
৬৪ জেলায় বাস্তবায়নাধীন ৭৬০ কোটি টাকার এই প্রকল্প কৃষিখাতে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তা তৈরির রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। তবে মাঠপর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো ব্যবস্থার জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ করবে। দুদকের অভিযান ও তদন্তের আশ্বাস মিললেও স্থানীয়দের প্রশ্ন—জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেবে?


আপনার মতামত লিখুন