ভোগান্তির অপর নাম ‘ডিলারশীপ’; প্রতারণার জালে চুয়াডাঙ্গার নতুন উদ্যোক্তারা

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৫ । ১১:০১ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের পণ্যবাজারে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার সেতুবন্ধন হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন স্থানীয় ডিলাররা। নিজের অর্থ, সুনাম ও ঝুঁকি নিয়ে বাজারে নিত্যপণ্য সরবরাহ করেন তাঁরা। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা-চক্রটিকেই টার্গেট করে একদল অসাধু কোম্পানি গড়ে তুলেছে সুপরিকল্পিত প্রতারণার নেটওয়ার্ক।

শত শত ব্যবসায়ীর অভিযোগ—ডিলার নিয়োগের নামে শুরু হয় প্রলোভনের খেলা, এরপর শুরু হয় অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রতারণা। সর্বশেষ ধাপ—কোম্পানি গায়েব, আর ডিলাররা পথে বসে।

অনুসন্ধানে উঠে এলো চক্রের কৌশল

মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে—

  • বড় বড় গ্রুপ অব কোম্পানির নাম ব্যবহার,

  • বাজারে নতুন পণ্যের “কৃত্রিম চাহিদা” তৈরি,

  • সর্বনিম্ন বিনিয়োগে ডিলারশিপের প্রলোভন,

  • অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর সময়ক্ষেপণ,

  • স্যাম্পল থেকে নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য পাঠানো,

  • বিক্রয় প্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা—

সব মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন অনুসরণ করে প্রতারক কোম্পানিগুলো।

অভিযোগ রয়েছে, উদ্দেশ্য একটাই—যত দ্রুত সম্ভব অগ্রিম টাকা সংগ্রহ করা। এরপর পণ্য, সাপোর্ট, যোগাযোগ—কিছুই আর পাওয়া যায় না।

চুয়াডাঙ্গার নতুন উদ্যোক্তার আর্তনাদ: ‘পুঁজির চেয়েও বড় ক্ষতি—সুনাম’

চুয়াডাঙ্গার কেদারগঞ্জ পাড়ার এক তরুণ উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে চক্রের আরও চিত্র পাওয়া যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনি জানান—

“একজন ব্যবসায়ীর মূল পুঁজি তার সুনাম। আর সেই সুনামই প্রতিদিন হারাচ্ছি। দোকানগুলো মাল চায়—কিন্তু কোম্পানি পণ্য দেয় না। আমার ওপরই চাপ পড়ে।”

তিনি আরও বলেন—

“অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর প্রথমে ফোন ধরত। তারপর দেরি করতে করতে হঠাৎ একদিন থেকে সব যোগাযোগ বন্ধ। কোম্পানির অফিসেও আর কাউকে পাওয়া যায় না। গুদাম ভাড়া, বেতন, পরিবহন—সব খরচ আমাকে বহন করতে হচ্ছে।”

তার দাবি, নতুন ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে এসব প্রতারণা বাড়ছে। কিন্তু নজরদারি নেই, অভিযোগ করেও সমাধান মেলে না।

কোম্পানি উধাও, মামলা করার কেউ নেই

কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়—
প্রতারিত ব্যবসায়ীরা মামলা করতে গেলেও জটিলতায় পড়েন।

  • কোম্পানির অফিস খুঁজে পাওয়া যায় না,

  • মালিক ও পরিচালকরা ফোন বন্ধ রাখেন,

  • চুক্তিতে উল্লেখিত ঠিকানায় যান—সেখানে কিছুই নেই,

  • অনেকে ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স ও ভুয়া ই-টিন ব্যবহার করে ব্যবসা চালান।

ফলে আইনগত পদক্ষেপ নিতে গিয়েও অনেক সময় ব্যর্থ হন ভুক্তভোগীরা।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: নিয়ন্ত্রণ না হলে বাজারে বাড়বে অস্থিরতা

বাজার বিশ্লেষকদের মতে—ডিলারশিপ প্রতারণা এখন নতুন ব্যবসায়িক অপরাধের রূপ নিয়েছে।
তাদের ভাষায়—

  • “ডিলারদের অর্থ নয়, পুরো বাজারব্যবস্থাই ঝুঁকিতে।”

  • “অসাধু কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে।”

সরকারি নজরদারি জোরদারের দাবি

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
ডিলার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সরকারি রেজিস্ট্রেশন যাচাই, কমপ্লায়েন্স চেক, ট্রেড লাইসেন্স ও ট্যাক্স ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি, প্রতারণা প্রতিরোধে

  • দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল,

  • ভোক্তা অধিকার–সদৃশ ডিলার অধিকার আইন,

  • এবং জেলা পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ ইউনিট গঠন প্রয়োজন।

নইলে এই চক্র আরও শক্তিশালী হবে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের সবচেয়ে বড় বাজারশক্তি—স্থানীয় ডিলাররা।

  কপিরাইট © দূর্নীতির ডায়েরি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন