রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রমেক) সামগ্রিক সেবা-ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা, অবকাঠামো সংস্কার ও রোগীসেবার মান উন্নয়নের দাবিতে “পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কার আন্দোলন” কর্মসূচি পালন করেছেন হাসপাতালের চিকিৎসক, ইন্টার্ন চিকিৎসক, ছাত্র-ছাত্রী, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও কর্মচারীরা।

‎বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) দুপুরে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।পালিত কর্মসূচিতে হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিটের চিকিৎসক ও কর্মরত নার্সরা অংশ নেন।

‎রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ, সেবার মান ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ব্যাপক পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছে।চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী, মেডিকেল প্রযুক্তিবিদসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা দূর করে রোগীদের জন্য একটি আধুনিক, সুশৃঙ্খল ও মানবিক পরিবেশ গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

‎অংশগ্রহণকারীরা আশরাফুল ইসলাম শামিম,জেসমিন আক্তার,নাসির উদ্দিন জানান,রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হলেও দীর্ঘদিন ধরে নানা অব্যবস্থাপনা, ভবনগুলোর জীর্ণদশা, অপর্যাপ্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট, নর্দমা–বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমস্যা ও সার্বিক সেবার ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব সমস্যা নিরসনে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

‎একাধিক বক্তা বলেন,হাসপাতালের বিভিন্ন ভবন ও ওয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে রং–মেরামত হয়নি, ওয়াশরুমগুলো নোংরা ও ব্যবহার–অযোগ্য অবস্থায় পড়ে থাকে।অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় চিকিৎসা ব্যাহত হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী কম থাকায় প্রতিদিন বর্জ্য ও অপরিষ্কার পরিবেশ রোগীসেবার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তারা মনে করেন, সেবা-প্রত্যাশীদের অধিকাংশই উত্তরাঞ্চলের নিম্নআয়ের মানুষ;তাই একটি পরিচ্ছন্ন, কার্যকর ও রোগীবান্ধব হাসপাতাল পরিচালনা জরুরি।

‎কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালের পরিবেশ ঠিক না থাকলে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও কর্মক্ষেত্র দুটোই বাধাগ্রস্ত হয়।রোগীরা যথাযথ সেবা না পেলে চিকিৎসকদের ওপর দায় বর্তায়, যা বাস্তবে হাসপাতালের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভব হয় না। তাই সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে জরুরি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

‎নার্সিং স্টাফরা বলেন, বেড সংকট, ভাঙা আসবাবপত্র, নন-ফাংশনাল ওয়াশবেসিন, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাবসহ নানান কারণে নার্সদের সেবা প্রদানে চরম সমস্যা তৈরি হয়। তারা বলেন “একটি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার মানই সেখানে রোগীসেবার মান নির্ধারণ করে। রমেকে তা অনেকদিন ধরেই ভুগছে।”

‎প্রতিবাদকারীরা জানান, হাসপাতালের সমস্যা চিহ্নিত করে একাধিকবার কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি। তাই দীর্ঘদিনের সঞ্চিত ক্ষোভ থেকেই চিকিৎসক, ছাত্র-ছাত্রী, নার্স ও কর্মচারীরা একত্রিত হয়ে “পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কার আন্দোলন” কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।

‎আন্দোলনকারীদের দাবি-হাসপাতালের সার্বিক পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে জনবল বাড়ানো ভবন ও ওয়ার্ডসমূহের জরাজীর্ণ অবস্থা সংস্কার,অকেজো যন্ত্রপাতি মেরামত অথবা নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন,নর্দমা–বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন,রোগীসেবায় নিয়মিত মনিটরিং টিম গঠন,নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত চিকিৎসা পরিবেশ নিশ্চিত করা।

‎কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা আরও জানান, তাদের দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

‎চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে একটি দৈনিক মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে।দেরি, অনুপস্থিতি বা দায়িত্বে গাফিলতির বিষয়ে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওষুধ সরবরাহ,পরীক্ষার রিপোর্ট,বেড ম্যানেজমেন্ট-সবকিছুই ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ে আনা হচ্ছে।

‎হাসপাতালের টয়লেট দীর্ঘদিন ধরেই রোগী–স্বজনদের জন্য ভোগান্তির কারণ ছিল। এজন্য দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করা হয়েছে।পানি সরবরাহ ঠিক রাখা, বর্জ্য পরিষ্কার করা, কর্মী নিয়োগ বাড়ানো এবং লক–সিস্টেমসহ নতুন সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। নারী ও শিশু রোগীদের জন্য আলাদা টয়লেট ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।

‎হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অবৈধ দোকানপাট,ভ্যান-রিকশার ভিড়, দালালচক্র-এসব নির্মূল করতে পুলিশ ও প্রশাসনের যৌথ নজরদারি বাড়ানো হবে। রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আলোবাতি স্থাপন, সিসিটিভি বৃদ্ধি এবং প্রবেশপথে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

‎রোগী ও স্বজনরা যেন হাসপাতালে অযথা ভিড় না করেন, সেবা নেওয়ার নিয়ম জানেন-এজন্য সচেতনমূলক লিফলেট, মাইকিং,নির্দেশিকা বোর্ড ও সাইনেজ স্থাপন করা হবে।হাসপাতালে কোনো ধরনের অনিয়ম বা হয়রানি হলে রোগীকে অভিযোগ জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট ডেস্কও চালু করা হচ্ছে।

‎হাসপাতালের বাহ্যিক অংশে নতুন গাছ লাগানো, দেয়ালে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক ছবি-পোস্টার, বসার জায়গা সংস্কারসহ নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করা হবে। চিকিৎসকরা আশা করছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হাসপাতালে রোগী সেবার মান আরও উন্নত হবে।

‎‎রোগী ও স্বজনরা ইতোমধ্যে পরিবর্তনের ছাপ দেখতে পাচ্ছেন বলে জানান তারা।পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাড়ছে, আচরণে পরিবর্তন এসেছে এবং কর্মীদের তদারকি জোরদার হয়েছে-এমন মন্তব্য করেছেন অনেকেই।

‎রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক এবি এম মারুফুল হাসান জানান-দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, যান্ত্রিক ত্রুটি,পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, রোগী ও স্বজনদের চাপ-সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালের সার্বিক সেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিল।এসব সমস্যা নিরসনে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ এবং পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১০ দফা মানদণ্ডে একটি বিশেষ সংস্কার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন,রোগীর নিরাপত্তা,স্বাচ্ছন্দ্য ও মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছি। এই পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কার আন্দোলন রংপুর মেডিকেলের সার্বিক সেবাকে আরও উন্নত করবে।”