ক্রিকেট বিশ্বে একটি প্রচলিত কথা আছে, অনির্ভরযোগ্য বা আনপ্রেডিক্টেবল পাকিস্তান। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে ২০ ওভারের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তারা আবারও প্রমাণ করল, কেন তাদের নিয়ে আগাম কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করা চলে না।
জয়ের খুব কাছে গিয়েও হারের খাদে পড়ে যাওয়া, আবার খাদের কিনারা থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় ছিনিয়ে আনা, এ যেন পাকিস্তান ক্রিকেটের চিরচেনা বৈশিষ্ট্য বা ডিএনএ।
১৪৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে এক নাটকীয় লড়াইয়ে ৩ উইকেটের জয় দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করলো পাকিস্তান। কলম্বোর আকাশ তখন মেঘলা ছিল, আর গ্যালারিতে থাকা পাকিস্তানি সমর্থকদের মুখে ছিল রাজ্যের অন্ধকার।
ডাচ বোলারদের তোপে এক সময় মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই বড় কোনো অঘটনের শিকার হতে যাচ্ছে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু ক্রিকেট বিধাতা হয়তো লিখে রেখেছিলেন অন্য কোনো চিত্রনাট্য। ৯ বলে ২৯ রানের সমীকরণ মিলিয়ে পাকিস্তান আজ বিশ্বকে জানাল যে এভাবেও জেতা যায়।
১৪৭ রানের মাঝারি লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান শুরুটা করেছিল বেশ সাবধানী। ২ উইকেটে ৯৮ রান তুলে ফেলার পর মনে হচ্ছিল ম্যাচটি তারা অনায়াসেই ১০ থেকে ১৫ বল বাকি থাকতে জিতে নেবে।
ক্রিজে ছিলেন অভিজ্ঞ বাবর আজম এবং ফর্মে থাকা সাহিবজাদা ফারহান। কিন্তু এরপরই শুরু হয় সেই চিরচেনা পাকিস্তানি ব্যাটিং ধস। মাত্র ১৬ রানের ব্যবধানে দলটি হারায় ৫টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। ৯৮ রানে ২ উইকেট থেকে মুহূর্তেই স্কোরবোর্ড দাঁড়ায় ১১৪ রানে ৭ উইকেট।
ডাচ স্পিনার ও মাঝারি গতির পেসারদের সামনে বাবর আজমদের অসহায় আত্মসমর্পণ দেখে মনে হচ্ছিল, নেদারল্যান্ডস তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয়টি পেতে যাচ্ছে। ম্যাচের সমীকরণ যখন শেষ ২ ওভারে ২৯ রান, তখন হাতে মাত্র ৩ উইকেট ছিল। ক্রিজে দুই বোলার শাহিন শাহ আফ্রিদি ও ফাহিম আশরাফ। ডাচ শিবিরে তখন জয়ের আনন্দ শুরু হয়ে গেছে। ১৯তম ওভার করতে আসেন অভিজ্ঞ লোগান ফন বিক। আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় ফাহিম আশরাফের তান্ডব।
সেই ওভারে তিনটি বিশাল ছক্কা এবং একটি চারে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেন এই অলরাউন্ডার। তবে এই নাটকীয়তায় নেদারল্যান্ডসের ফিল্ডার বা ক্ষেত্ররক্ষক ম্যাক্স ও’ডাউডের একটি বড় ভুলও ছিল।
ওভারের দ্বিতীয় বলে ফাহিমের একটি সহজ ক্যাচ লুফে নিতে ব্যর্থ হন তিনি। সেই জীবন ফিরে পাওয়া ফাহিম আর পেছনে ফিরে তাকাননি। ওই এক ওভারেই পাকিস্তান তুলে নেয় ২৪ রান। ১৯তম ওভার শেষে জয়ের জন্য শেষ ৬ বলে দরকার ছিল মাত্র ৫ রান।
শাহিন আফ্রিদি ও ফাহিম আশরাফ মিলে মাত্র ৩ বল খরচ করেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যান। ৯ বলে ২৯ রান নেওয়ার অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ৩ উইকেটের জয় নিশ্চিত করে পাকিস্তান।
ম্যাচ বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের এই জয় যেমন স্বস্তির, তেমনি উদ্বেগেরও। চাপের মুখে শেষের ব্যাটারদের দায়িত্বশীলতা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা দলটির ইতিবাচক দিক। বিশেষ করে ফাহিম আশরাফের অলরাউন্ড নৈপুণ্য পাকিস্তানের জন্য বড় প্রাপ্তি।
তবে নেতিবাচক দিক হলো উপরের দিকের এবং মাঝের সারির ব্যাটারদের ধারাবাহিকতাহীনতা। ৯ ওভারে ৫০ রান দরকার, এমন সহজ সমীকরণ থেকে ম্যাচকে শেষ ওভার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়াটা বড় দলগুলোর জন্য কাম্য নয়।
অন্যদিকে ডাচরা আজ দুর্দান্ত লড়াই করেছে। বিশেষ করে মাঝের ওভারে পাকিস্তানের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে তারা ম্যাচটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু ক্যাচ মিস এবং ১৯তম ওভারে খেই হারিয়ে ফেলায় তীরে এসে তরী ডুবল তাদের।
লোগান ফন বিকের মতো অভিজ্ঞ বোলার এক ওভারে ২৪ রান দিয়ে ফেলায় ডাচ অধিনায়ক স্কট এডওয়ার্ডসের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট ছিল। পাকিস্তান ক্রিকেট মানেই রোলার কোস্টার রাইড বা চরম অনিশ্চয়তা।
তারা হারতে হারতে জিতে যায়, আবার জিততে জিততে হেরে যায়। কলম্বোর এই জয়টি তাদের আত্মবিশ্বাস জোগালেও ব্যাটিং ধস নিয়ে কাজ করার বড় বার্তা দিয়ে গেল। তবে দিনের শেষে স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে যে পাকিস্তান ৩ উইকেটে জয়ী।