সিএমপি’র চকবাজার ওসি বাবুল আজাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও মিথ্যা মামলার ভয় দেখানোর অভিযোগে সদর দপ্তরের তদন্ত

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)–এর চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবুল আজাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্যতা এবং নিয়মিত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করছে পুলিশ সদর দপ্তর

পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে থাকা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে একটি গোপন তদন্ত প্রতিবেদনও তৈরি হয়েছে।

পিআইও’র পাঁচ পৃষ্ঠার গোপন প্রতিবেদন

জানা গেছে, পুলিশ ইন্টারনাল ওভারসাইট (পিআইও) ইউনিট পাহাড়তলী ও ডবলমুরিং থানায় দায়িত্ব পালনের সময়কার বিভিন্ন অনিয়মের সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও অডিও রেকর্ডসহ পাঁচ পৃষ্ঠার একটি গোপন প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দেয়। প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি গণমাধ্যমের কাছেও পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

থানা সূত্রে জানা যায়, ওসি বাবুল আজাদ বদলির সময় সেলিম সরকারসহ কয়েকজন এএসআই ও এসআইকে সঙ্গে নিয়ে যান, যাদের বিরুদ্ধেও প্রতিবেদনে অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে।

সদর দপ্তর থেকে বিষয়টি নগর পুলিশে তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। তবে ওসির সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সুসম্পর্কের কারণে প্রকাশ্যে কেউ অভিযোগ দিতে সাহস পাননি বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। পুনরায় হয়রানির আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী তদন্ত কর্মকর্তার কাছেও সাক্ষ্য দেননি।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) মোহাম্মদ ফয়সাল আহমেদ বলেন, সদর দপ্তর থেকে একটি তদন্ত এসেছিল এবং তা পূর্বসূরি অতিরিক্ত কমিশনার তদন্ত করে ঢাকায় পাঠিয়েছেন। তবে তিনি প্রতিবেদনের বিস্তারিত সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান।

‘টাকা না দিলে একাধিক মামলায় চালান’

পিআইও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চাহিদামতো টাকা দিলে একটি মামলায় চালান দেওয়া হতো; আর টাকা না দিলে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর উত্তর আগ্রাবাদ এলাকা থেকে সাগির আহমদ নামে এক ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের কর্মী পরিচয়ে আটক করা হয়। চারটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ভয় দেখিয়ে তার পরিবারের কাছ থেকে চার লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মোট ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে মনসুরাবাদ এলাকায় এক বিকাশ এজেন্টকে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগে থানায় নিয়ে গিয়ে পরে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে।

ওয়ার্ড মেম্বার ও বিএনপি নেতার অভিযোগ

পাহাড়তলী থানায় দায়িত্ব পালনকালে এক ওয়ার্ড মেম্বারের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা এবং তার সহযোগীর কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে ৫১ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া, পাহাড়তলী ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক এক নেতার অভিযোগ—চাঁদা না দেওয়ায় তাকে সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় আসামি করার ভয় দেখানো হয়। পরবর্তীতে অর্থ দেওয়ার পরও অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।

আটক, ভয়ভীতি ও অর্থের বিনিময়ে মুক্তির অভিযোগ

গত ১১ জুলাই নগরীর মোগলটুলী মোড় থেকে সাত যুবককে আটক করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, তাদের মধ্যে পাঁচজনকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং বাকি দুজনকে মামলায় চালান করা হয়।

এ ছাড়া, গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর চৌমুহনী কর্ণফুলী মার্কেট এলাকা থেকে এক যুবককে তুলে নিয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে ৪০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবকের দাবি, পরিবার টাকা দেওয়ার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

জুয়ার আসর ও মাদক ব্যবসা থেকে মাসিক আদায়ের অভিযোগ

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডবলমুরিং থানায় দায়িত্ব পালনকালে একটি জুয়ার আসর থেকে মাসিক এক লাখ টাকা নেওয়া হতো। পাশাপাশি বিভিন্ন স্পটে মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তালিকাভুক্ত ১৬ জন মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাসিক অর্থ নেওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওসি বাবুল আজাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট তৎকালীন উপ-পুলিশ কমিশনারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।